বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, সিরাজগঞ্জ: এক সময় বাংলার গ্রাম মানেই ছিল তাঁতের শব্দ। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত টকটক শব্দে চলত কাঠের তাঁত। সেই শব্দে মিশে থাকত জীবনের ছন্দ, পরিশ্রমের ঘাম আর সৃজনশীলতার আনন্দ।
তাঁতের শাড়ি ও খদ্দরের কাপড় ছিল বাঙালির দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আজ সেই তাঁতঘরগুলো নীরব, আর বুননের সেই শব্দ হারিয়ে যেতে বসেছে।
গ্রামবাংলার নারীরা শাড়ি বুনতেন পরিবারের প্রয়োজন আর জীবিকার তাগিদে। পুরুষেরা সামলাতেন সুতো, রং আর বাজার। একটি শাড়ি বুনতে লাগত দিনের পর দিন।
প্রতিটি নকশা, প্রতিটি রঙের পেছনে থাকত গল্প, অঞ্চলভেদে আলাদা পরিচয়। টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, নরসিংদী—প্রতিটি অঞ্চলের তাঁতের শাড়ির ছিল নিজস্ব বৈশিষ্ট্য।
খদ্দরের কাপড় ছিল সাধারণ মানুষের পোশাক। গরমে আরামদায়ক, ঘামে ভেজা শরীরে সহনীয়, সহজ কিন্তু দৃঢ়। স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় খদ্দর হয়ে উঠেছিল আত্মমর্যাদার প্রতীক। নিজের দেশের সুতো, নিজের দেশের শ্রম—এই চেতনায় মানুষ খদ্দর পরত গর্ব নিয়ে।
কিন্তু সময় বদলেছে। বাজার দখল করেছে কারখানার তৈরি কাপড়। ঝকঝকে, হালকা, কম দামে সহজলভ্য পোশাকের ভিড়ে তাঁতের শাড়ি আর খদ্দর টিকতে পারেনি। তাঁতিরা একে একে পেশা ছাড়ছেন। অনেক তাঁতঘর এখন তালাবদ্ধ, কোথাও কোথাও তাঁত বিক্রি হয়ে গেছে কাঠের দামে।
সিরাজগঞ্জের বেলকুচির এক প্রবীণ তাঁতি আব্দুল করিম বলেন, “আমার বাবা তাঁতি ছিলেন, আমিও ছিলাম। কিন্তু আমার ছেলে আর এই পেশায় আসেনি। মাসের পর মাস শাড়ি বুনেও ন্যায্য দাম পাওয়া যায় না। এখন দিনমজুরের কাজ করে সে।”
তাঁতের কাপড় হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে এক ধরনের জীবনবোধ। আগে পাড়ায় পাড়ায় তাঁতিরা বসবাস করতেন, উৎসবের সময় নতুন শাড়ি বোনা হতো, মেয়েদের বিয়েতে তাঁতের শাড়ি ছিল গর্বের বস্তু। এখন বিয়ের বাজারেও জায়গা দখল করেছে বিদেশি নকশার কাপড়।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, তাঁতের কাপড় শুধু পোশাক নয়, এটি পরিবেশবান্ধব, টেকসই এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের বাহক। অথচ পরিকল্পিত পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এই শিল্প ধ্বংসের পথে। কিছু উদ্যোগ থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।
আজ কোনো পুরনো বাড়ির কোণে পড়ে থাকা ভাঙা তাঁত দেখলে মনে হয়—এ যেন থেমে যাওয়া এক সময়ের সাক্ষী। তাঁতের শাড়ি আর খদ্দরের কাপড় হারিয়ে গেলে হারাবে শুধু একটি পণ্য নয়, হারাবে বাংলার শ্রম, শিল্প আর আত্মপরিচয়ের এক গভীর অধ্যায়।









